সুনামগঞ্জ : ভ্রমণপিপাসুদের পিপাসা মেটায় যে জেলা

সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সুনাম বিশ্বব্যাপী। হাওরের সঙ্গে পাহাড়ের মিশেল, এ অঞ্চলকে প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে করেছে আকর্ষণীয়। পাশাপাশি আকাশ আর বিলের অনিন্দ্যসুন্দর মিতালি ভ্রমণপিপাসুদের অশান্ত মনে প্রশান্তি এনে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এমনকি পাহাড় আর আকাশের সুনীল দৃশ্যপট ছড়িয়ে পড়ছে বিল, ফসলের মাঠেঘাটে। যত দূর চোখ যায়, এ যেন প্রকৃতির স্বর্গ! বাংলার রূপ এত মুগ্ধকর, তা সুনামগঞ্জ না গেলে হয়তো অজানাই রয়ে যেত!

সুনামগঞ্জ শহরে চোখ রাখলেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে। শহরের চারপাশেই যেন পৃথিবীর শেষ সীমানা! পাহাড় আর আকাশের গভীর রসায়নে এমনটাই মনে হবে।

সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরির পর মনে পড়লো সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের কথা। টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে এর আগে টেলিভিশনে একটি প্রতিবেদন দেখেছিলাম। সিলেট এসে টাঙ্গুয়ার হাওর না দেখে যাব, সেটা কেমন করে হয়?
পরদিন সকালে সিলেট থেকে রওনা দেই সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে। সে দিন ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজটা শহরেই পড়ে নিলাম। নামাজ শেষে আমাকে টাঙ্গুয়ার হাওর নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেল চালক প্রস্তত। নামাজ শেষ করেই উঠে পড়লাম মোটরসাইকেলে। চলছি, আর উপভোগ করছি আমার দেখা পৃথিবীর সেরা কোন স্থান। যতই যাচ্ছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। রীতিমত বোকা বনে যাচ্ছি। এ প্রকৃতি না দেখে এতদিন রইলাম কেমন করে?

বন্যায় সুনামগঞ্জের সড়কগুলো প্রাণ হারিয়েছে। তবুও, বাইকার বাইক চালাচ্ছেন আপন গতিতে। শহর থেকে বহুদূরের পথ টাঙ্গুয়ার হাওর। যে দিকেই চোখ যায়, প্রকৃতির মহনীয় সব দৃশ্যের সঙ্গে আমার সখ্যতা বাড়ছে। এ যেন প্রকৃতির স্বর্গে বিচরণ। ফসলের মাঠে তখন ধান। মাঠ জুড়ে সবুজের তেপান্তর। পাহাড় আর প্রকৃতির মিশেল যেন মনে করিয়ে দেয়, এ বাংলার রূপের কাছে সব দেশ হেরে যায়।

যাদুকাটা নদী
চলতে চলতে চলে এলাম যাদুকাটা নদীতে। নদীর তীরে চোখ রাখতে না রাখতে নদীর জলে চোখ যেন আটকে যায়। এত অপরূপ হতে পারে নদীর পানি! মূলত ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ ছুঁয়ে এ পানি যাদুকাটা নদীতে বয়ে চলে। স্বচ্ছ পানি বলে একদম নীল বর্ণে ছেয়ে থাকে নদীটি। লোকমুখে শোনা যায়, নদীর তীরে এক গৃহবধূ তার শিশুপুত্র যাদুকে কো‌লে নি‌য়ে এই নদীর মাছ কাটছিলেন। এক পর্যায়ে অন্যমনস্ক হ‌য়ে মাছের জায়গায় তার কোলের শিশুকে কেটে ফেলেন। পরবর্তীতে সেই প্রচলিত কাহিনী থেকেই নদীটির নাম হয় যাদুকাটা নদী। এ নদী থেকে উত্তোলন করা হয় বালু, পাথর ও কয়লা। বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে আরেক রূপ ধারণ করে যাদুকাটা। শুষ্ক মৌসুমে নদীর দুই কূলে জেগে ওঠা বিশাল চরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলে পানির প্রবাহ।

এ নদীতে মোটরযান চলাচলের ফেরির মত ট্রলার চলে। ট্রলারের একপাশে বসে যাদুকাটা নদীর জল ছোঁয়া, মুখ ধোয়া, পানি খাওয়ার নস্টালজিয়া ছেপে বসেছে৷ আর ফোনটা বের করে ছবি তোলার নেশাটা তো বরাবরের মতোই আছে।

কিছুক্ষণ পর ট্রলার ভিড়লও ওপারে। ট্রলার থেকে বাইকার আমাকে নিয়ে চললেন শিমুল বাগানের গন্তব্যে। শিমুল বাগান, নীলাদ্রি পার হয়ে যেতে হবে টাঙ্গুয়ার হাওর। সময়ে কুলাবে কিনা, তা নিয়ে যেন এক প্রকার দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। যাই হোক, এরই মাঝে পৌঁছলাম, তাহিরপুরের বিখ্যাত সেই কাঙ্ক্ষিত শিমুল বাগানে।

শিমুল বাগান
এটি বাংলাদেশের সেরা একটি পর্যটন কেন্দ্র। প্রতি বছর বসন্তে, যখন শিমুল ফুল ফোটে, তখন এ শিমুল বাগানে মানুষের তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। যেমনটা দেখা গেছে এবারেও। যদিও আমার যাওয়া হয়েছে ফুল ফোঁটার অনেক আগে। সারি সারি শিমুলের গাছ দেখে মনে হলও, এ যেন কোন যাদু দিয়ে আঁকা! যাদুকাটা নদীর তীর বলে কথা! চোখের ওপারে পাহাড়ের মুগ্ধকরা দৃশ্য হৃদয় লাগে। শিমুল বাগানে নাম মাত্র টাকায় টিকেট সংগ্রহ করে ঢোকা যায়। ভেতরে ঘোড়ায় করে ঘুরে বেড়ানো যায়। কেউ আবার ছবি তোলেন শিমুলের সান্নিধ্যে। ছবি তোলার জন্য এখানে গড়ে উঠেছে পেশাদার ফটোগ্রাফারের দল। মন চাইলে আপনিও তাদের ক্যামেরায় ছবি তুলতে পারবেন।

নীলাদ্রি লেক
শিমুল বাগানে বেশিক্ষণ থাকা হল না। টপকে চলতে শুরু করলাম। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। যেতে হবে বহুদূর। ক্ষেতের মাঝ দিয়েও চলাচলের পথ। আধা ঘণ্টা সময় পর নীলাদ্রি হাজির। বাইক থেকে নেমে পড়লাম। নীলাদ্রি লেকের দৃশ্যগুলো উপভোগ করতে লাগলাম। একদম সীমান্ত ঘেঁষা নীলাদ্রি। খুব কাছ থেকেই কাঁটাতার দেখা যায়। সঙ্গে পাহাড়ের ঢং, রঙ! নীলাদ্রি লেকের পানির স্বচ্ছ জলও মন ছুঁয়ে দেয়। উঁচু নিচু টিলা আর লেকের দৃশ্য এখানে মনকে নাচিয়ে তোলে। সময় করে গেলে নীলাদ্রি লেকে ছোট ছোট খেয়া হয়ে লেকের বুকে কিছুটা সময় কাটানো কোন ব্যাপার-ই না। পর্যটকদের কাছে নীলাদ্রি লেক বেশ জনপ্রিয় একটি নাম।

টাঙ্গুয়ার হাওর
নীলাদ্রি লেক পাড়ি দিয়ে চললাম বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর টাঙ্গুয়ার পথে। আমার পাইলট বললেন, আমাকে আরও এক ঘণ্টা জার্নি করতে হবে। তারপর টাঙ্গুয়ার হাওর! এত এত জার্নি, তবুও যেন ক্লান্তি আসে না। এর কারণ খুঁজে পেলাম, প্রকৃতির স্বর্গে এসেছি বলেই ক্লান্তির টের পাই না। ঘণ্টা খানেক জার্নির পর আমি চলে এলাম স্বপ্নের একটি জায়গায়। তাহিরপুরের একটি বাজারে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটি খেয়া পাই। স্থানীয় যুবক ইউনুছ আমাকে নিয়ে চললেন হাওরের দিকে।

পড়ন্ত বিকেল তখনো। সূর্য ফিরে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। ঠিক এই সময়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকে খেয়া হয়ে চলছি। উপভোগ করছি হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য। হাওরের বুকে বসে একইসঙ্গে চাঁদ আর সূর্য দেখা, এ যেন স্বপ্নের মতো। গোধূলির হাওরের দৃশ্যটা ছিল সবচে বেশি উপভোগ্য। এত দূরের ভ্রমণ যেন তৃপ্তি মিটলও হাওরে গোধূলির দৃশ্য দেখে। সন্ধ্যা নেমে এলো। যদিও হাওরের অতটা গভীরের যাওয়া হল না, তবে হাওরের প্রকৃতিতে মুগ্ধ হয়েছি।

কিভাবে যাবেন এই চারটি দর্শনীয় স্থানে
ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি সুনামগঞ্জের বাস পাওয়া যায়। আর ট্রেনে যেতে হলে কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সিলেট পর্যন্ত যেতে হবে। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জের কোন রেলপথ নেই। চাইলে সিলেট পর্যন্ত গিয়ে সিলেট থেকে বাস অথবা মাইক্রো বাসে করে সুনামগঞ্জ যেতে পারবেন। আর সেখান থেকে মোটরসাইকেল ভাড়া করে আপনি যেতে পারবেন যাদুকাটা নদী, শিমুল বাগান, নীলাদ্রি লেক এবং টাঙ্গুয়ার হাওরে৷ মোটরসাইকেল আপনাকে খরচ গুণতে হবে আটশ-নয়শ টাকার মতো। আর ঢাকা সুনামগঞ্জে যাতায়াতে ১হাজার টাকা। ২ হাজার টাকার মধ্যেই আপনি ঘুরে আসতে পারছেন এই চারটি সেরা দর্শনীয় স্থানে।

সর্তকতা
যে বিষয়ে বরাবরই সর্তক হতে হবে, তা হলও, যেহেতু আপনার ভ্রমণের জায়গাটি প্রান্তিক এলাকায়। সেজন্য মানসিকভাবে যেকোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। মোবাইলের চার্জ ও ব্যালেন্স ঠিক মতো রাখতে হবে। আর খুব সকাল পৌঁছতে হবে, যাতে সন্ধ্যা হয়ে না যায়। সন্ধ্যা নামার আগে আগেই আপনাকে চলে আসতে হবে।

থাকবেন কোথায়
আজকাল জেলা শহরগুলোতে পর্যাপ্ত হোটেল গড়ে উঠেছে। সুনামগঞ্জ গিয়ে থাকতে হলে আপনাকে জেলা শহরকেই বেছে নিতে হবে। সার্কিট হাউজ, জেলা পরিষদের ডাকবাংলো ছাড়াও ভিআইপি গেস্ট হাউজ তো আছেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *