অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস নীরব ঘাতক

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন খুব দ্রুত আবিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু সারা পৃথিবীতে এখনো যে মহামারিটির ভ্যাকসিন আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি, সেই মহামারির নাম হলো ডায়াবেটিস। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে ডায়াবেটিসের রোগী নেই। আমাদের দেশে বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ রোগীর ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো সহজে ধরা পড়েনা। একটু দেরি করে লক্ষণগুলো বোঝা যায় বা পরীক্ষা করলে রোগ ধরা পড়ে। সমস্যা হলো প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কষ্ট হয়না বলেই মানুষ সচরাচর পরীক্ষা করায় না।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী সুস্থ মানুষের মতোই কাজ করতে পারবেন। কিন্তু বছরের পর বছর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা হয়ে ওঠে নীরব ঘাতক। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অবশ্যই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীকে নিয়মিত রক্তে চিনির মাত্রা মাপতে হবে। ডায়াবেটিস রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সেই মোতাবেক চলতে হবে। কাউকে ওষুধ খেতে হয়, কেউবা ইনসুলিন ইনজেকশনের জন্য উপযোগী। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য দরকার ডায়েট, ডিসিপ্লিন এবং ড্রাগ বা ওষুধ। রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওষুধও লাগে না। তাই চেষ্টা করতে হবে রক্তে চিনির মাত্রা যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে। রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যাওয়ার নামই ডায়াবেটিস। এই রোগ বছরের পর বছর নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃৎপিন্ড, কিডনী, চোখ, সারা শরীরের স্নায়ুগুলোর ওপর পড়ে নেতিবাচক প্রভাব। পুরো শরীরের সমস্ত অঙ্গ দুর্বল হয়ে পড়ে। রক্তে বেড়ে যায় ইনফেকশানের মাত্রা। এই ইনফেকশনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অবশ্যই রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর শরীরের কোথাও কেটে গেলে বা ঘা হলে তা শুকাতে সুস্থ মানুষের তুলনায় বেশি সময় লাগে।

রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে স্বাস্থ্যঝুঁকির পরিমাণটা কমে আসে। আমাদের পেটের মধ্যে প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয় নামে এক ধরণের অঙ্গ রয়েছে। এই অঙ্গ থেকে ইনসুলিন নামের একধরণের হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন সঠিকভাবে কাজ করতে না পারলে রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যায়। ইনসুলিন হরমোনের কাজ হলো রক্তে চিনির মাত্রা কমিয়ে দেয়া। ডায়াবেটিস হলে ইনসুলিন হরমোন ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না বা দেহে সঠিকভাবে তৈরি হয় না। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পরেও যদি খাদ্যাভাস, জীবনযাপন পদ্ধতি সঠিকভাবে মেনে চলা যায়, নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে থাকা যায়, তাহলে অবশ্যই ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পরেও তিনি কোনো ধরণের সমস্যা অনুভব করেন না, সেজন্য তিনি রক্ত পরীক্ষা করান না, সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করেন না। এমনটা কখনোই উচিত নয়। কোনো ধরণের শারীরিক সমস্যা না থাকলেও ডায়াবেটিস রোগ বেড়ে যেতে পারে। সেজন্য ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদেরকে অবশ্যই নিয়মিত রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং নিয়মিত পরীক্ষা করাতে হবে।

অনেক সময় রক্তে চিনির মাত্রা বেশি হওয়ার পরেও শারীরিক কষ্ট নাও থাকতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে তা হয়ে উঠবে আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অধিকাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীকে দেখে বোঝা যায়না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। দীর্ঘ বছর পরে অনেকের চেহারা খারাপ হয়ে যায়, ওজন কমে যায়। কিন্তু রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে থাকলে তা ঘুণে ধরা পোঁকার মতো পুরো শরীরকে দুর্বল করে দেয়। সেজন্য নিয়মিত রক্তে চিনির মাত্রা পরিমাপের পাশাপাশি প্রতি বছর বা ছয়মাস পর পর পুরো শরীরের চেকআপ করানো ভীষণ জরুরি। পুরো শরীরের সম্ভব না হলেও কিছু জরুরি পরীক্ষা করানো দরকার। তাহলে ডায়াবেটিসের কারণে অন্যান্য অঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হলো কি না তা ধরা পড়বে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে চোখের রেটিনাসহ চোখের অন্যান্য অংশগুলোও দুর্বল হয়ে যায়। তাই চোখের চেকআপও ছয়মাস পর পর ভীষণ জরুরি। তা সম্ভব না হলে প্রতি বছর চেকআপ করাতে হবে। বর্তমান যুগ হলো প্রযুক্তি নির্ভর। আমাদের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবের স্ক্রিনে চোখ রাখতে হয় দীর্ঘ সময়। এতে চোখের পাওয়ারের পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের সচেতন হতে হবে আরো বেশি।

নিয়মিত চোখ ও সমস্ত শরীরের চেকআপ করাতে হবে। পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য খাবার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যায়াম জরুরি। দীর্ঘ বছর ডায়াবেটিস থাকলে রক্তনালীগুলোও দুর্বল হয়ে যায়। অতিরিক্ত তেল, চর্বিযুক্ত খাবার খেলে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে চর্বি রক্তনালীতে জমতে শুরু করবে। প্রথম কয়েক বছর হয়তো কোনো সমস্যাই হবে না। কিন্তু এইভাবে রক্তনালীতে চর্বি জমতে থাকলে, হৃৎপিন্ডের শিরা-উপশিরাতে রক্ত সঠিকভাবে চলাচল করতে পারবেনা। তখন তৈরি হবে হৃদরোগ। বেড়ে যাবে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে দাঁতও খুব দ্রুত বিভিন্ন ধরণের অসুখে আক্রান্ত হয়। সম্ভব হলে প্রতি বছর দাঁতের স্কেলিং করাত হবে অথবা দাঁতেরও চেকআপ করানো দরকার। ডায়াবেটিক ফুট ডায়াবেটিসের রোগীদের পায়ের একধরণের অসুখ। পায়ের নিচে কোথাও মাংসপেশী শক্ত হয়ে গেলে বা পায়ের কোনো আঙুলে স্পর্শ করলে যদি কোনো অনুভূতি পাওয়া না যায় এবং এই সমস্যা যদি বারবার অনুভুত হয় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকলে এবং শারীরিক কোনো সমস্যা না থাকলেও শরীরের সব অঙ্গের ওপরে পড়ে নেতিবাচক প্রভাব। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখাটা অপরিহার্য।