গ্যাস্ট্রিক : প্রতিরোধ ও প্রতিকার

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়নি এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। আমাদের দেশের মানুষের জন্য এটি খুব পরিচিত একটি অসুখ বা সমস্যা বলা যায়। গ্যাস্ট্রিককে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ অসুখ মনে হলেও এটি সারিয়ে না তুললে ধীরে ধীরে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। এই সমস্যা আগেভাগে নির্ণয় করা গেলে সহজে সারিয়ে তোলা সম্ভব।

পেটের যেকোনো সমস্যাকেই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বলে মনে করা উচিত নয়। এটি আমাদের খুবই ভুল ধারণা যে আমরা আমাদের পেটের যেকোনো সমস্যা, অসুবিধাকে গ্যাস্ট্রিকের রোগ বলে মনে করে নেই শুরু থেকেই। এতে করে সঠিক রোগের ডায়াগনোসিস ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে খুব সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কেউ বাজার কিংবা ফার্মেসি থেকে গ্যাস্ট্রিকের বড়ি নামে বিক্রি হওয়া অনেক ড্রাগ কিনে নিয়ে আসেন আর না বুঝে সেগুলো সেবন করেন। এতে করে অজান্তেই আমরা নিজের শরীরের অনেক ক্ষতি করে ফেলি, যা বুঝতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। চিকিৎসাও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে যা খুবই দুঃখজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। এখন আমি মূলত আলোচনা করবো এই গ্যাস্ট্রাইটিস রোগ সম্বন্ধে। যা আশা করি আপনাদের সবার উপকারে আসবে।

আমরা যখন কোনো খাবার গ্রহণ করি, তখন খাদ্য পরিপাকের জন্য এবং খাদ্যে উপস্থিত অনুজীবসমূহকে ধ্বংস করার জন্য পাকস্থলী থেকে হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCl) নামে একপ্রকার এসিড ক্ষরণ হয়, যা খাদ্য পরিপাকে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। হাইড্রোক্লোরিক এসিডের অনেক ভূমিকা আছে এই খাদ্য পরিপাক প্রক্রিয়ায়। এটি অন্যতম মূল উপাদান আমাদের খাবারকে হজম করানোর ক্ষেত্রে।আবার গ্যাসট্রাইটিসসহ গ্যাস্ট্রিক আলসার ও অন্যান্য পেটের অসুখও এর জন্য দায়ী হতে পারে।

একজন সুস্থ মানুষের পাকস্থলীতে প্রতিদিন প্রায় ১.৫-২ লিটার HCl ক্ষরণ হয়। যা হাইড্রোক্লোরিক এসিড ক্ষরিণ হওয়ার স্বাভাবিক মাত্রা। এই হাইড্রোক্লোরিক এসিড ক্ষরণের মাত্রা যদি কোনো কারণে বেড়ে যায়, তখন পেটের ভেতরের আবরণ তথা মিউকাস মেমব্রেনে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। হাইড্রোক্লোরিক এসিড দিয়ে মিউকাস মেমব্রেনের যে প্রদাহ হয়, এই অবস্থাকে গ্যাস্ট্রাইটিস রোগ বলে। যা অনেক সময় গ্যাস্ট্রিক আলসার কিংবা রক্তক্ষরণ জনিত ভয়াবহ সমস্যার সূত্রপাত করতে পারে।

গ্যাস্ট্রাইটিস হবার প্রক্রিয়া
আমাদের পেট থেকে প্রতিনিয়ত হাইড্রোক্লোরিক এসিড ক্ষরণ হয়। তাই যখন পাকস্থলী খালি (empty stomach) থাকে, তখন হাইড্রোক্লোরিক এসিডসমূহ ব্যবহৃত না হয়ে অধিক জমা হয়ে যায়, কারণ হাইড্রোক্লোরিক এসিডের কাজ হচ্ছে খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করা। যখন পেট খালি থাকে কিংবা পেটে কোনো খাবারই থাকে না, তখন অতিরিক্ত এসিড পাকস্থলীতে জমে যায়। অতিরিক্ত এসিডের কারণে তখন পাকস্থলীর ভেতর ক্ষত হয়ে যায় এবং পর্যায়ক্রমে তা অন্ত্রের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে। আবার পাকস্থলির উপরের দিকে খাদ্যনালী তথা ইসোফেগাসের দিকেও ছড়িয়ে যেতে পারে। যা রোগীর জন্য মারাত্মক সমস্যার কারণ হতে পারে।

এসিড যদি পাকস্থলির উপরের দিকে খাদ্যনালী বা ইসোফেগাসকে আক্রান্ত করে, তবে এই অবস্থাকে জারড বা Gastro-Esophageal Reflux disorder (GERD) বলা হয়। এই ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির বেশি বেশি ঢেকুর উঠবে এবং বুক জ্বালাপোড়া করবে। সকালে ঘুম থেকে উঠলে গলায় কফ জমে থাকতে পারে। বমি বমি ভাব থাকবে। টক ঢেঁকুর উঠতে পারে। এসব সমস্যা থাকলে তখন বুঝতে পারা যায় এটি (GERD)। সেক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যবস্থা কিছুটা ভিন্ন হয়ে থাকে।

প্রদাহের পরিমাণ বেড়ে পাকস্থলির মাঝে আলসার তৈরি করতে পারে, যাকে আমরা গ্যাস্ট্রিক আলসার বলে থাকি। আলসার হতে থাকলে সেখানে কোষসমূহের গাঠনিক পরিবর্তন আসতে পারে, এক প্রকারের কোষ অন্যপ্রকার কোষে রূপান্তরিত হতে পারে, যাকে চিকিৎসকরা মেটাপ্লেসিয়া (Metaplasia) বলেন এবং পরিশেষে তা থেকে Dysplasia এমনকী ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। যা খুবই খারাপ পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটাতে পারে। তখন চিকিৎসা আরো জটিল রূপ নেয়। অনেক সময় সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।

গ্যাস্ট্রাইটিস রোগের উপসর্গ

* পেটের বামপাশে ব্যথা
* বুক জ্বালাপোড়া
* খাবারে অরুচি
* পেট জ্বালাপোড়া
* পেট ফেঁপে থাকা
* মাথা ঘুরানো
* বমি বমি ভাব
* অল্প খাবারের পর পেট ভরে গেছে মনে হওয়া
* GERD এর ক্ষেত্রে বুকে ব্যথা, অধিক হারে ঢেঁকুর ও বমিভাব
* ডিউডেনাম আলসার হলে পেটের মাঝামাঝি ব্যথা এবং ব্যথা পুরো পেটে ছড়িয়ে পড়া
* গ্যাস্ট্রিক আলসারের সবচেয়ে অপরিচিত উপসর্গ হচ্ছে খাবার খাওয়ার চাহিদা বেড়ে যাওয়া। অধিকহারে খাবার পরেও রোগীর ক্ষুধা লাগবে। কারণ আলসারের কারণে অনেক সময় দেখা যায়, পাকস্থলি থেকে ব্রেইনে হাঙ্গার সেন্টারে নার্ভ সিগনাল সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারেনা। তাই রোগী পেট ভরে খেলেও হাঙ্গার সেন্টার সঠিক মেসেজ না পাওয়ার কারণে ক্ষুধার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

আমাদের জীবনযাপনের নানা ভুল অভ্যাসই হতে পারে গ্যাস্ট্রিকের কারণ। সেসব অভ্যাস বদলে কিংবা নিয়ন্ত্রণ করে এই সমস্যা থেকে দূরে থাকা যায়। গ্যাস্ট্রাইটিস রোগের কারণ জেনে নিন-

অনিয়মিত খাওয়া

অনিয়মিত খাবার খাওয়া গ্যাস্ট্রাইটিস এর অন্যতম মূল কারণ। খাবার অনিয়মিত খেলে কিংবা দুই বেলার খাবারের মাঝে দীর্ঘ বিরতি থাকলে হাইড্রোক্লোরিক এসিডের ক্ষরণ বেড়ে গিয়ে গ্যাস্ট্রাইটিস হয়ে যায়। তাই নিয়মিত খাবার গ্রহণ করা, সময়ের ব্যবধান ঠিক রাখা, কোনো বেলা না খেয়ে থাকা পরিহার করা- এসব বিধি মেনে জীবন যাপন করতে পারলে খুব সহজেই এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।

ভাজা-পোড়া খাবার

গ্যাস্ট্রাইটিস রোগের আরো একটি বিশেষ কারণ হলো তেলে ভাজা খাবার কিংবা অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খাওয়া। তেলের খাবার হাইড্রোক্লোরিক এসিডের ক্ষরণ বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। অনেকেই তেলে ভাজা খাবার খুব পছন্দ করেন। কেউ কেউ খুব বেশি ভাজা পোড়া খাবার খেয়ে থাকেন। বাড়িতে কিংবা বাইরে এসব খাবার খাওয়া কখনোই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এসব খাবার অতিরিক্ত খেলে খুব দ্রুতই যে কেউ গ্যাস্ট্রিকের এসব সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে বাইরে, খোলা বাজারে, রাস্তায় এসব ভাজা-পোড়া খাবার ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে। যারা সচেতন থাকতে চান তারা এসব খাবার এড়িয়ে যাবেন এবং সেই সাথে চেষ্টা করবেন বাড়িতেও ভাজা-পোড়া খাবার না খাওয়ার অভ্যাস করা। কারণ এটি শুধু গ্যাস্ট্রাইটিসই নয়, শরীরের নানারকম রোগের কারণ হতে পারে।

কোমল পানীয়

কোমল পানীয় অনেকেরই খুব পছন্দ। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা এটি খুব পছন্দ করে। এসব সফট ড্রিংক খাওয়া গ্যাস্ট্রাইটিসের অন্যতম কারণ এবং অনেক সময় গ্যাস্ট্রাইটিস বাড়িয়ে দেয়। সাময়িক ভালো লাগলেও এটি শরীরের জন্য ভালো নয়। সেইসাথে অ্যালকোহলজাতীয় পানীয়তে আরো ঝুঁকি থাকে। লিভারেরও ক্ষতি করে এসব পানীয়।

ধূমপান

এটি এমন কোন ক্ষতি নেই যা করে না। গ্যাস্ট্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীর জন্য ধুমপান খুবই বিপজ্জনক। প্রত্যেক সচেতন মানুষেরই উচিত ধূমপান না করা। সেই সাথে যখন কেউ ধূমপান করে তখন তার আশেপাশে না থাকা।

পানি কম পান করা

আমরা অনেকেই পানি কম পান করে থাকি। মূলত অবহেলা করে আমরা পানি কম পান করি। পানি আমাদের শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। পানি কম পান করলে পরিপাক ক্রিয়ায় অসুবিধা দেখা যায়। তখন তন্ত্রের নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। খাবার হজম ঠিক রাখতে নিয়মিত বেশি করে পানি পান করা উচিত। দিনে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। পানি আমাদের শরীরের মেটাবলিজম ঠিক রাখবে।

খাওয়ার পরেই ঘুম

রাত্রে খাবার খেয়ে সাথে সাথে ঘুমিয়ে গেলে GERD হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তাই রাতে খাবার খেয়ে সাথে সাথে ঘুমিয়া যাওয়া উচিত না। সেজন্য খাবারের পরে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করা, বসে থাকা উচিত। এতে করে খাবার খাদ্যনালী থেকে পাকস্থলিতে সঠিকভাবে পৌঁছাবে।

মাংস বেশি খাওয়া

অনেকেই আছেন যারা একসঙ্গে অনেকখানি মাংস খেয়ে ফেলেন। রেড মিট, মুরগি, খাসি এসব খুব বেশি খাওয়া উচিত নয়। এতে করে হজমে সমস্যা হয় এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

ব্যথার ওষুধ

ব্যথার বড়ি বা পেইন কিলার মেডিসিনের সাইড ইফেক্ট হিসাবে গ্যাস্ট্রাইটিস ও গ্যাস্ট্রিক আলসার হতে পারে। তাই ব্যথার ওষুধ খেলে সাথে একটি এসিড নিউট্রালাইজিং খেতে হবে।

বিশেষ ব্যাক্টেরিয়া

একটি বিশেষ ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা ইনিফেকশন হলে ডিউডেনাল আলসার হতে পারে।

গ্যাস্ট্রাইটিস প্রতিরোধে পরামর্শ

* নিয়মিত খাবার খান, বেশি বেশি পানি পান করুন।
* রাত্রে খাবারে পর ২০-৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করে ঘুমাতে যান।
* সকালে ইসুবগুলের ভূসি ভিজিয়ে পান করুন। এতে করে অতিরিক্ত হাইড্রোক্লোরিক এসিড নিউট্রালাইজড হয়ে যাবে।
* সকালে খালি পেটে ২ গ্লাস পানি পান করুন।
* দিনে ১৩০ গ্রামের বেশি মাংস খাবেন না।
* তেলে ভাজা ও তৈলাক্ত খাবার পরিহার করুন।
* একসাথে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।

গ্যাস্ট্রাইটিসের জন্য চিকিৎসা :

* প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরি শ্রেণির মেডিসিনগুলো এসিডিটি থেকে মুক্তি দিতে ভূমিকা রাখে। সেসব ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে।
* এন্টাসিড শ্রেণীর ড্রাগসমূহ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে পারেন।
* H. pylori ডায়াগনোসিস হলে ট্রিপল থেরাপি দেওয়া হয়।
* বমিবমি ভাব থাকলে Domperidon ব্যবহার হয়।

এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসক রোগীকে প্রয়োজনীয় ড্রাগ দিয়ে চিকিৎসা দেবেন। নিজ থেকে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের নাম করে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত। নিয়মিত সুন্দর জীবনযাপন ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস এসব রোগ থেকে নিরাপদ রাখতে পারে। যেকোনো সমস্যায় চিকিৎসকের কাছে গেলে জটিলতা রোধ করা যায়।