শূন্যতা আঁকড়ে ধরেছিল কোহলিকেও

সাফল্য আর ব্যর্থতা জীবনেরই অংশ। কিন্তু দারুণভাবে সফল যারা তাদের কাছে ব্যর্থতার তেতো স্বাদটা সম্ভবত একটু বেশিই প্রকট হয়ে ধরা দেয়। অন্তত ভারতীয় অধিনায়ক বিরাট কোহলির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমনই হয়েছিল। সম্প্রতি মার্ক নিকলাসের সঙ্গে এক আলাপে উঠে এলো, টানা ব্যর্থতা নিদারুণ একাকীত্বও উপহার দিয়েছিল তাকে।

সম্প্রতি মার্ক নিকলাসের ‘নট জাস্ট ক্রিকেট’ শীর্ষক এক পডকাস্টে কোহলি বলেন, ‘আপনার ঘুম ভাঙল, তখনই মনে পড়ল আপনি আর রান করতে পারছেন না, এ অনুভূতিটা দারুণ কিছু নয় মোটেও। আর আমার মনে হয়, সব ব্যাটসম্যানদেরই এমন সময় আসে যখন মনে হয় আপনি কোনো কিছুরই নিয়ন্ত্রণ নিতে পারছেন না।’

২০১৪ সালে ইংল্যান্ড সিরিজে পাঁচ টেস্টের দশ ইনিংসের একটি ইনিংসেও অর্ধশতক ছুঁতে পারেননি। সে সিরিজে স্টুয়ার্ট ব্রড আর জেমস অ্যান্ডারসনের নিয়মিত শিকারে পরিণত হয়েছিলেন কোহলি। কেমন অনুভূতি হচ্ছিল তখন কোহলির? ভারতীয় ব্যাটসম্যানের উত্তর, ‘এ থেকে পরিত্রাণের উপায়টাই বের করতে পারবেন না আপনি। সেটা এমন একটা সময় ছিল যখন আমি আর কিছুই বদলে দিতে পারছিলাম না। নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে একা মানুষ মনে হচ্ছিল তখন।’

ক্যারিয়ারে এর পর আরও অনেকবার কঠিন সময় এসেছে তার। এই গেল বছরই তো শতকের দেখা পাননি কোনো ফরম্যাটেই। তবু কোহলির কাছে সেই ইংল্যান্ড সিরিজটাই হয়ে আছে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সময়। বললেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমাকে সেই সময়টা বুঝিয়ে দিয়েছিল যে আপনি একটা বড় দলের অংশ হয়েও একাকীত্বে পড়তে পারে। আমি বলবো না যে আমার আশেপাশে মানুষজন ছিলেন না, যাদের কাছে আমি পেশাদার সাহায্য পেতে পারতাম। কিন্তু আমি যে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, তা পুরোপুরি বুঝতে পারার মানুষের অভাব ছিল। আমি মনে করি এটা অনেক বড় একটা ব্যাপার।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি এ বিষয়টার পরিবর্তন চাই। যে কোনো সময়েই এমন কেউ থাকা উচিত, যার কাছে যে কোনো পর্যায়ে গিয়ে বলতে পারবেন যে, শোনো, আমার এমন মনে হচ্ছে। আমি ঠিকঠাক ঘুমাতেও পারছি না। সকালে ঘুম থেকেও উঠতে ইচ্ছে করছে না। আত্মবিশ্বাস একেবারে তলায় গিয়ে ঠেকেছে, আমি কি করবো?’

‘অনেক মানুষই বড় সময় ধরে এমন অনুভূতি নিয়ে ভোগে, অনেক মাস ধরে, একটা পুরো ক্রিকেট মৌসুম ধরে এটা বয়ে নিয়ে চলে, এ থেকে বেরোতে পারে না। সত্যি বলতে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এক্ষেত্রে পেশাদার সাহায্য থাকা উচিত।’
বিরাট কোহলি, অধিনায়ক, ভারতীয় ক্রিকেট দল

কয়েক দিন আগে কেভিন পিটারসেনের সঙ্গে এক আলাপচারিতায়ও এ ব্যাপারে কথা বলেছিলেন কোহলি। যে ভুল তিনি করেছিলেন, সে ভুল না করার জন্য তরুণ ক্রিকেটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘যেসব তরুণ ক্রিকেটার শুনছে তাদের বলতে চাই, আমি ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে রান করার জন্য খুব বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছিলাম। দল আমার কাছে কী চাইছে সেটা নিয়ে চিন্তাই করতে পারছিলাম না। আমার তখন মনে হচ্ছিল, এখানে টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করতে পারলেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারব। বাইরের ব্যাপারে ভাবছিলামই না। এ ব্যাপারটা আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। ধীরে ধীরে নিচের দিকেই নেমে যাচ্ছিলাম আর এ থেকে কিছুতেই বেরোতে পারছিলাম না। এটা ভয়াবহ এক অনুভূতি।’

খেলোয়াড়দের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিরাট কোহলি একটু বেশিই চিন্তিত। তারই ফল হিসেবে কিনা, গেল বছর আইপিএলে একমাত্র দল হিসেবে তার দল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর একজন মনোবিদ নিয়ে দুবাই যাত্রা করেছিল। তিন মাসের দীর্ঘ জৈবসুরক্ষা বলয়ের মানসিক অবসাদ এড়ানোই ছিল এর মূল লক্ষ্য।