মত প্রকাশের স্বাধীনতায় ইসলামের নির্দেশনা

অন্যের মত, পরামর্শ, ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের প্রতি ইসলাম সবসময় শ্রদ্ধাশীল। গঠনমূলক সমালোচনাকে ইসলাম সবসময় স্বাগত জানায়। ভিন্নমতের প্রতি ইসলামের আচরণ সহানুভূতিপূর্ণ কারণ মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে সুষ্ঠু সমাজ গঠন ও পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সহিষ্ণুতা নিঃসন্দেহে মানবিক গুণাবলীর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এবং সামাজিক মূল্যবোধ নির্মাণের তাৎপর্যপূর্ণ বুনিয়াদ। অপরের কথা, বক্তব্য, মতামত, পরামর্শ ও জীবনাচার যতই বিরক্তিকর ও আপত্তিকর হোক না কেন তা সহ্য করার মত ধৈর্য ও স্থৈর্য যদি মানুষের মধ্যে না থাকে তা হলে সমাজে নৈরাজ্য, উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে বাধ্য। মত প্রকাশের স্বাধীনতা যদি বাধাগ্রস্থ হয় তাহলে আধিপত্যবাদ ও স্বৈরাচার সমাজ ও রাষ্ট্রে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

তাই যে জাতি যত বেশি সহনশীল ওই জাতি তত বেশি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও অগ্রসর। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন, আস্থা অর্জন ও সৌহার্দ্য সৃষ্টির জন্য পরমত সহিষ্ণুতার গুণ অপরিহার্য পূর্বশর্ত। পবিত্র কুরআন সহিষ্ণুতার মহৎ গুণটি অর্জনের জন্য জোরালো ভাষায় তাগিদ দিয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও মহান চার খলিফা নিজেদের জীবনে পরের মতামত ও বিশ্বাসের প্রতি নমনীয় ও সহানুভূতিপ্রবণ ছিলেন ইতিহাসে তার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ইসলাম উৎসাহিত করেছে এটা সঠিক তবে সেটাকে বল্গাহীন করেনি কারণ কোন উগ্র মতামত ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য যদি অপরের, দলের, জাতি, গোষ্ঠীর ও ধর্মের অনুভূতিকে আহত করে অথবা সমাজে ফিৎনা-ফ্যাসাদের জন্ম দেয় তাহলে তা বর্জনীয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, “তারা সত্যের আদেশ দেয় এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখে” (সূরা আত-তাওবা: ৭১; আলে ইমরান: ১০৪)।

উপর্যুক্ত গুণ মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া সৃষ্টি হতে পারে না। বর্ণিত আয়াতে কেবল উক্ত স্বাধীনতার গ্যারান্টিই নিশ্চিত করে না। বরং এই স্বাধীনতাকে ব্যবহার করার পথ ও নির্দেশ করে দেয়। একজন মুসলমান মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কেবল সত্য ও কল্যাণের বিকাশে ব্যবহার করতে পারেন। অসত্য ও অন্যায় প্রচারে এই স্বাধীনতা ব্যবহৃত হতে পারে না কারণ এটা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—

তারা অন্যায়ের আদেশ দেয় এবং সত্য ও কল্যাণে বাধা দান করে” (সূরা আত-তাওবা: ৬৭)। পবিত্র কুরআনে বনি ইসরাইলের পতনের অন্যতম কারণ নির্দেশ করে বলা হয়েছে, “তারা যেসব গর্হিত কাজ করতো তা হতে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করতো তা কতই না নিকৃষ্ট।
(সুরা আল মায়িদা: ৭৯)

মহানবী (সা.) বলেন, “অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা-ন্যায় কথা বলা উত্তম জিহাদ” (মুসনাদে আহমদ, শায়খ আবু বকর আল জাযায়েরী, মিনহাজুল মুসলিম, পৃ.১২০)।

সমাজে মানুষের ওপর যদি কোনো শাসক নির্যাতন ও জুলুম চালায় তাহলে সে জালিম ও স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করার এবং ক্ষুব্ধ মতামত ব্যক্ত করার জন্য ইসলাম জনগণকে অধিকার দিয়েছে। জালিমের জুুলুম চোখ বুঝে সহ্য করা যাবে না; জোরালো ভাষায় এর প্রতিবাদ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “মন্দ কথার প্রচারণা আল্লাহ পছন্দ করেন না তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে” (সূরা আন-নিসা: ১৪৮)।

মন্দ কথা নিতান্ত গর্হিত কাজ কিন্তু জুলুম যখন সীমা লঙ্ঘন করে; ধৈর্যের বাধ যখন ভেঙে যায়; অস্থির অবস্থায় মুখ থেকে জালিমের বিরুদ্ধে যদি কোন বিরূপ মন্তব্য বেরিয়ে আসে তাহলে আল্লাহ নির্দেশিত উন্নত নৈতিক চরিত্রের শিক্ষা সত্ত্বেও শেষ অবস্থায় তা ক্ষমারযোগ্য। মজলুমের এটা অধিকার যে জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখে উচ্চারণ করবে— এটা করতে গিয়ে যদি ভাবাবেগে শালীন ও পরিশীলিত বক্তব্য রাখতে অক্ষম হয় তাহলে তাকে আল্লাহর নিকট এই জন্য কোন জবাবদিহি করতে হবে না (মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, বুনিয়াদী হুকুক, পৃষ্ঠা : ২৬৬)।

ইতিহাস একথা স্পষ্ট সাক্ষী দেয় যে, মদীনা প্রজাতন্ত্রের জনগণ নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে মহানবী (সা.) ও চার পুণ্যবান খলিফার সামনে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারতেন। মহানবীর (সা.) অভ্যাস ছিল যে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সাহাবায়ে কেরামের মতামত নিতেন এবং মত প্রকাশে উৎসাহিত করতেন। উহুদের যুদ্ধের সময় মহানবী (সা.) এবং বিশিষ্ট সাহাবাদের মত ছিল মদীনা শহরের অভ্যন্তরে অবস্থান করে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া কিন্তু হযরত হামজাহ (রা.) এবং অপেক্ষাকৃত যুবক সাহাবগণ শহরের বাইরে কোনো উন্মুক্ত প্রান্তরে গিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের এই মতামত গ্রহণ করে উহুদের প্রান্তরে কুরাইশদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। একদা মহানবী (সা.) যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী যুদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করছিলেন। একজন বলে উঠেন, “গনীমাতের বণ্টন আল্লাহর ইচ্ছের পরিপন্থী হয়েছে।” রাসূলুল্লাহ (সা.) কেবল জবাব দিলেন, “আমি যদি ইনসাফ না করি তাহলে ইনসাফ করবে কে?” কিন্তু ভিন্ন মত পোষণকারীদের মুখবন্ধ করে দেননি।

জুবায়ের (রাদি.) এবং এক আনসারীদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের এক মামলা বিশ্বনবীর (সা.) আদালতে প্রেরিত হয়। সাক্ষী প্রমাণ ও তথ্যাদি যাচাই করে বিশ্বনবী (সা.) হযরত যুবাইরের অনুক‚লে রায় প্রদান করেন। কিন্তু আনসারী ক্রোধান্বিত হয়ে মন্তব্য করেন, ‘আপনি ফুফাত ভাইয়ের পক্ষে রায় দিলেন।’ এটা ছিল বিশ্বনবীর (সা.) সততা ও ন্যায় ইনসাফের প্রতি খোলা চ্যালেঞ্জ কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে ক্ষমা করে দেন। ভিন্নমতের জন্য কোন শাস্তি দেননি। এক যুদ্ধ অভিযানের সময় মহানবী (সা.) মুসলমানদের হুকুম দিলেন যে, অমুক অমুক জায়গায় তোমরা শিবির স্থাপন কর। এক সাহাবী জানতে চাইলেন এই হুকুম আল্লাহ প্রদত্ত ওহী? না আপনার ব্যক্তিগত অভিমত ? রাসূল বলেন! এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। সাহাবী উত্তর দিলেন অমুক জায়গা শিবির স্থাপনের উপযোগী নয় বরং এর পরিবর্তে অমুক অমুক স্থান ক্যাম্প স্থাপনের উপযোগী এবং সহায়ক। আল্লাহর রাসূল নিঃসকোচে সাহাবীর এই অভিমত মেনে নেন।

ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাদি.) মতামতের স্বাধীনতা অনুমোদন করে জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমাকে অনুসরণ করো যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করব। যদি আমি গোমরাহীর পথে পরিচালিত হই তবে তোমরা আমাকে সঠিক পথের দিশা দেবে।” হযরত ওমর (রাদি.) ক্ষমতায় থাকাকালীন বক্তৃতারত অবস্থায় মদীনার জনগণকে বলেন, “আমি যদি ভুল পথে পরিচালিত হই তখন তোমরা কি করবে”? তাৎক্ষণিকভাবে একজন উত্তর দিলেন, “এই তরবারী দিয়ে সোজা পথে নিয়ে আসবো।” পরমত সহিষ্ণুতার এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে দুনিয়াবাসী অভিভুত হয়েছে। হযরত ওমরের (রাদি.) খিলাফতকালে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র প্রধান ও প্রাদেশিক গভর্ণরের কর্মকাÐের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মতামত ও অভিযোগ পেশ করতে পারতেন। কোন নাগরিককে ভিন্নমত প্রকাশে বাধা দেয়া হত না। হযরত আমর ইবনে আস (রাদি.) হযরত মুগিরা ইবনে শো’বা (রাদি.) হযরত আবু মুসা আশআরী (রাদি.) ও হযরত সা’দ ইবনে ওয়াক্কাসের (রাদি.) মত খ্যাতনামা প্রাদেশিক গভর্ণরদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ হযরত ওমর (রাদি.) প্রকাশ্যে জনসমক্ষে শুনানী করতেন।

পথ চলার সময় এক মহিলা হযরত ওমরকে (রাদি.) লক্ষ্য করে বলেন, ওমর! তোমার এই অবস্থার জন্য আফসোস! আমি তোমার পূর্বের অবস্থা দেখেছি যখন তুমি লাঠি হাতে ওকায প্রান্তরে ছাগল চড়াতে। আজ তোমার এই অবস্থাও দেখছি যখন মানুষ তোমাকে আমিরুল মুমিনীন নামে সম্বোধন করে। জনগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। যে ব্যক্তি আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করবে সে আখিরাতের দূর জগতকে একান্ত কাছে পাবে। যার মৃত্যু-ভয় আছে সে সর্বদা এই চিন্তায় বিভোর থাকবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত অবসর সময় যাতে বিনষ্ট না হয় সে ব্যাপারে সচেতন থাকবে। জার আবদী, যিনি হযরত ওমরের (রাদি.) সাথে ছিলেন, মহিলার এই বক্তব্য শুনে বলেন; “আপনি আমিরুল মুমিনীনের সাথে বাড়াবাড়ি করলেন।” হযরত ওমর তৎক্ষণাৎ তাকে বাধা দিয়ে বলেন, “মহিলা যা বলতে চান নির্দ্বিধায় তাঁকে বলতে দাও। তুমি হয়তো জান না ইনি হচ্ছেন খাওলা বিনতি সা’লাবা যার কথা সপ্ত আকাশের উপরে স্বয়ং আল্লাহ শুনেন, সেখানে আমি ওমর কি ছাই যে, তাঁর বক্তব্য শুনব না” (আমীন আহসান ইসলাহী, ইসলামী রিয়াসত, পৃ-৬২)।

একবার আব্বাসীয় খলিফা বাদশাহ হারুনর রশীদ হজ্ব করতে গেলেন। কাবাগৃহ, তাওয়াফ করার সময় আবদুল্লাহ ইবন ওমর ডাক দিয়ে বলেন, ‘বলুন তো এ বছর কত মানুষ হজ্ব সম্পাদন করছেন ? খলিফা বলেন, এর সঠিক সংখ্যা তো একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন।’ আবদুল্লাহ ইবন ওমর বলেন, হে আল্লাহর বান্দা! একথা ভুলে যাবেন না এ বিশ্ব চরাচরে যত মানুষ আছে প্রত্যেক নিজের কর্মকাÐের জন্য ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর কাছে দায়ী আর আপনাকে আপনার শাসনাধীন সব জনগণের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। একটু ভেবে দেখুন, হিসেব নেয়ার সময় আপনার কী অবস্থা হবে? প্রতাপশালী সম্রাট এই বক্তব্য শুনে কান্না জুড়ে দেন এবং আবদুল্লাহ ইবন ওমরকে এই মতামতের জন্য কিছু বললেন না (রঈস আহমদ জাফরী, ইসলামী জামহুরিয়ত, পৃ.১৬৪)। এই কথা মনে রাখা দরকার যে, ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিকের ধর্মবিশ্বাস ও নিজস্ব চিন্তাধারা পোষণ ও লালনের অধিকার রয়েছে। পবিত্র কুরআনের ফায়সালা, “ধর্মের ব্যাপারে জোর জবরদস্তি নেই; সত্য পথ ভ্রান্ত পথ হতে সুস্পষ্ট হয়েছে” (সূরা বাকারাহ : ২৬৫)। মানবজাতির প্রতি মহানবী (সা.) দায়িত্ব ব্যাখ্যা করে মহান আল্লাহ বলেন; “অতএব আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, আপনিতো উপদেশদাতা। আপনিতো তাদের জোর জবরদস্তিকারী (কর্মনিয়ন্ত্রক) নন” (আল-গাশিয়াহ : ২১-২২)।

ওয়াসাক রুমী নামের এক খ্রিস্টান ক্রীতদাস বহু বছর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের (রাদি.) কাছে ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি হযরত ওমর ইবনে খাত্তাবের (রাদি.) ক্রীতদাস ছিলাম। তিনি আমাকে বলতেন, “মুসলমান হয়ে যাও, যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করো তাহলে আমি তোমাকে মুসলমানদের আমানতদারীর কোন দায়িত্ব অর্পন করবো।” কিন্তু আমি ইসলাম কবুল করিনি। এতে হযরত ওমর (রাদি.) বলেন, “লা ইকরাহা ফিদ্দীন” (ধর্মের ব্যাপারে জোর জবরদস্তি নেই।) মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলে তিনি আমাকে মুক্ত করে দেন এবং বলেন তোমার যেখানে ইচ্ছে সেখানে চলে যেতে পারো” (আবু উবাইদ, কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ১৫৪)। এ ঘটনা প্রমাণ করে ইসলামের অপরাপর জনগোষ্ঠীকে দাওয়াত দেয়ার নিয়ম আছে কিন্তু জোর করে ধর্মান্তরিত করার বিধান নেই-হযরত ওমরের এই সহনশীল ঘটনাই তার দৃষ্টান্ত।

হযরত ওমর (রাদি.) জেরুজালেম সফরের সময় বায়তুল মাকদাসে এক গীর্জার প্রকোষ্টে নামায আদায় করেন। পরে চিন্তা করলেন তার এই নামাযকে মুসলমানরা প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করে খ্রিষ্টানদেরকে গীর্জা থেকে বের করে দিতে পারে। পরে তিনি এক অঙ্গীকার নামা লিখে গীর্জাটি খ্রিষ্টানদের উপাসনার জন্য নির্দিষ্ট করে দেন। তিনি মুসলমানদেরকে দলবদ্ধভাবে গীর্জায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন কেবল এক ওয়াক্তে মাত্র একজন মুসলমান গীর্জায় ঢুকতে পারবে (মুহাম্মদ হোসাইন হাইকাল, ওমর : ফারুকে আযম, পৃ. ৩০২)।

ধর্ম বিশ্বাসের স্বাধীনতার ব্যাপার ইসলামের নির্দেশ জরবদস্তি না করার মধ্যে কেবল সীমাবদ্ধ নয় বরং কারো অনুভূতি যাতে আহত না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য হুকুম দেওয়া হয়েছে। মুর্তিপূজারীদের প্রতিমার উদ্দেশ্য কোন বিরূপ মন্তব্য করা যাবে না- এটাই কুরআনের নির্দেশ, “আল্লাহকে ব্যতীত যাদেরকে তারা ডাকে তোমরা তাদেরকে গালি দিও না” (সূরা আনআম : ১০৮)। ধর্মীয় বিতর্কে অনেক সময় মানুষ সতর্কতার সীমা ছেড়ে যায় এবং বিরুদ্ধ বিশ্বাসীদের গালাগালির টার্গেটে পরিণত করে। তাদের উপাসকদের পাশাপাশি শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদেরও তারা গালাগালি ও অশালীন মন্তব্য করতে দ্বিধা করে না। পবিত্র কুরআন কঠোর ভাষায় মুসলমানদের নির্দেশ দিচ্ছে, “তোমরা উত্তম পন্থা (শালীনতা ও যুক্তি) ব্যতীত কিতাবীদের (ইহুদী-খ্রিষ্টান) সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ো না” (সূরা আনকাবুত : ৪৬)। কুরআনে বর্ণিত ‘আহসান’ শব্দটি বহুবিধ অর্থবোধক। ভদ্রতা, সৌহার্য্য, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, যুক্তি প্রভৃতি ভাল গুণাবলীই ‘আহসান’ এর অন্তর্ভূক্ত।

উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশিষ্ট মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন, কিতাবধারীদের সাথে উত্তম পন্থায় তর্ক-বিতর্ক করো। যেমন কঠোর কথা-বার্তার জবাব নম্র ভাষায়, ক্রোধের জবাব সহনশীলতায় এবং মুর্খতা সুলভ হট্টগোলের জবাব গাম্ভীর্যপূর্ণ কথা-বার্তার মাধ্যমে দাও (মা’আরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত, বাংলা সংস্করণ, পৃ. ১০৩১)।

ধর্ম বিশ্বাস ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে নাগরিক অধিকার। হযরত আলীর (রাদি.) খিলাফত কালে খারিজী স¤প্রদায়ের অভ্যুদয় ঘটেছিল। বর্তমান কালের নৈরাজ্যবাদী (ঘরযরষরংঃ) দলসমূহের সাথে ছিল তাদের অনেকটা সামঞ্জস্য। হযরত আলীর (রাদি.) খিলাফত কালে তারা প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের অস্থিত্ব অস্বীকার করত, বক্তব্য রাখত এবং অস্ত্র বলে অস্থিত্ব বিলোপের জন্য বদ্ধপরিকর ছিল। হযরত আলী (রাদি.) তাদের কাছে নি¤েœাক্ত পয়গাম পাঠান, “তোমরা যেখানে ইচ্ছে বসবাস করতে পার। তোমাদের ও আমাদের মাঝে এই চুক্তি রইল যে, তোমরা রক্তপাত করবে না, ডাকাতি করবে না এবং কারো ওপর জুলুম করবে না, তোমরা যতক্ষণ বিপর্যয় ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তোমাদের আক্রমণ করব না (নায়লুল আওতার, ৭ম খন্ড, পৃ-১৩০-১৩৩)। উক্ত বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট ভাব প্রমাণিত হয় যে, কোন দলের মতবাদ যাই হোক না কেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মত যেভাবে প্রকাশ করুন না কেন ইসলামী রাষ্ট্র তাতে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না কিন্তু তারা যদি নিজেদের মত শক্তি প্রয়োগ (ইু ারড়ষবহঃ সবধহং) বাস্তবায়িত করতে এবং রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা চূর্ণবিচূর্ণ করার চেষ্টা করে তবে তাদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে (মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী, ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধান, পৃ. ২৩৮)।

সা’দ ইবনে উবাদাহ আনসারী ছিলেন মদীনার ভিন্ন মতাবলম্বী এক বিশিষ্ট ব্যক্তি। খিলাফতের ব্যাপারে তিনি অন্যদের মতের সাথে একমত হতে পারেননি। যার কারণে হযরত আবু বকর (রাদি.) ও হযরত ওমরের (রাদি.) হাতে জীবদ্দশায় বাইয়াত গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, জনগণকে সংগঠিত করে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের ব্যাপারে নিজের মতামত তুলে ধরতেন। অবশ্য ফ্যাসাদ ও বিদ্রোহ সৃষ্টি করেননি। হযরত ওমরের (রাদি.) খিলাফত কালে তিনি মদীনা ছেড়ে সিরিয়া চলে যান। হযরত আবু বকর (রাদি.) ও হযরত ওমর (রাদি.) ভিন্নমতাবলম্বী এ ব্যক্তিকে জোর করে আনুগত্য প্রদর্শনের উদ্যোগ নেননি এবং বাইয়াত গ্রহণ না করার অভিযোগে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেননি।

পরিশেষে আমরা একথা জোর দিয়ে বলতে পারি যে, মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ইসলাম সবসময় সহিষ্ণু মনোভাব প্রদর্শন করেছে। কারণ সহনশীলতার অভাবে মত প্রকাশ বাধাগ্রস্থ হলে সুষ্ঠু সমাজ বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বিবেকের স্বাধীনতা না থাকলে ব্যক্তি হয়ে পড়ে স্থানু, নিষ্পন্দ ও নির্জীব। চিন্তার স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বিবেকের স্বাধীনতা সুশীল সমাজের ও সভ্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব স্বাধীনতা ব্যক্তির সহজাত অধিকার (ঘধঃঁৎধষ জরমযঃং)। ইসলামে রয়েছে এইসব অধিকারের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণ ব্যক্তির পাঁচটি অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে অপরদিকে ইসলাম মানুষের সতেরটি অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা তন্মধ্যে অন্যতম। ইসলাম ব্যক্তির অধিকারের (জরমযঃং) পাশাপাশি নৈতিক বাধ্যবাধকতাকেও (ঙনষরমধঃরড়হ) সমান গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম মানুষের অধিকার রক্ষার সবচেয়ে বড় ঝান্ডাবাহী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *