মুসলিম সমাজে সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারা

কয়েক শ বছর ধরে চলে আসা উপমহাদেশের শিক্ষানীতি ব্রিটিশরা বাতিল করে দিয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্যে। তারা নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। এ শিক্ষানীতি প্রণয়নের দায়িত্ব পড়ে লর্ড মেকলের ওপর। ওই শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ কী—এর বর্ণনাও পাওয়া যায় মেকলের জবানে। ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লর্ড মেকলে বলেন, ‘আমি ভারতবর্ষের (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ঘুরে বেড়িয়েছি, কিন্তু কোথাও একজন ভিক্ষুকও আমার চোখে পড়েনি, একজন চোরও আমি দেখতে পাইনি। এ দেশে সম্পদের এত প্রাচুর্য এবং এ দেশের মানুষগুলো এতটাই যোগ্যতাসম্পন্ন ও উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী যে এ দেশকে আমরা কখনোই পদানত করতে পারব না, যদি না তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলতে পারি। এ দেশের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই হচ্ছে সেই মেরুদণ্ড। এ কারণে আমার প্রস্তাব হচ্ছে, আমরা এখানকার প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতি এমন একটি শিক্ষা ও সংস্কৃতি দিয়ে প্রতিস্থাপন করব, যাতে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিক ভাবতে শেখে যে যা কিছু বিদেশি ও ইংরেজদের তৈরি, তা-ই ভালো ও নিজেদের দেশের থেকে উত্কৃষ্টতর। এভাবে তারা নিজেদের ওপর শ্রদ্ধা হারাবে, তাদের দেশজ সংস্কৃতি হারাবে এবং এমন একটি পরাধীন জাতিতে পরিণত হবে, ঠিক যেমনটি আমরা চাই।’ (https://goo.gl/g8HmDC)

লর্ড মেকলের এই ভাষণ স্বামী বিবেকানন্দের Saving Humanity বইয়ের ১৬৯-১৭০ পৃষ্ঠায়ও রয়েছে।

ইংরেজদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য সম্পর্কে ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৩৫ সালে কলকাতার গভর্নর কাউন্সিলে লর্ড মেকলে বলেন, ‘…They Will be Indian in Blood and Color but Appetite and thought Will be an European’ (Woodrow, Macaulay’s Minutes on Education in India-1862)

লর্ড মেকলের মিশন বাংলাদেশে কতটা সফল হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায় লেখক জেমস জে. নোভাকের লেখায়। তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর এশিয়ায় ছিলেন। উপমহাদেশের অজস্র স্থান ভ্রমণ করেছেন। তিনি একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম BANGLADESH REFLECTIONS ON THE WATER. বাংলায়ও এটি অনূদিত হয়েছে। বাংলায় নাম দেওয়া হয়েছে—‘বাংলাদেশ : জলে যার প্রতিবিম্ব’।

তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো, “বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা-সংস্কৃতির অনেক আচার-প্রথা এমনভাবে ঢুকে গেছে যে তা থেকে বাংলাদেশকে আলাদা করা যাবে না। বিচারক পরচুলা পরেন এখানে সেই ব্রিটিশ অনুশাসনের জন্যই। জেনারেলরা হতে চান ‘ফিল্ড মার্শাল’। সেটা একটা ব্রিটিশ আকাঙ্ক্ষা। সিভিল সার্ভিসের অভিধাগুলোও ব্রিটিশদের অনুরূপ। এককথায়, বাংলাদেশ তার ঔপনিবেশিক প্রভু থেকে সিভিল ও সামরিক—এই দুই প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কিছু অনুসরণ-অনুকরণ করেছে। এটা তাদের উত্তরাধিকার।”

তিনি আরো লিখেছেন, “কখনো কখনো মনে হয়, বাংলাদেশের অবস্থান যেন ঠিক ‘এশিয়াতে’ও নয়, ভারত উপমহাদেশেও নয়—মাঝামাঝিতে। একটা জিনিস খুব কৌতুকাবহ মনে হয়, তা হলো—বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে ব্রিটিশ আমলের নিদর্শন খুব বেশি নেই। তার কারণ হয়তো এই যে বাংলাদেশে ব্রিটিশ পর্ব এখনো অব্যাহত আছে!’’

বর্তমানে চিন্তা, আদর্শ, লাইফস্টাইল ও সংস্কৃতিতে বাঙালি মুসলমানের জীবনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এসেছে। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় পর্যন্ত বাঙালির জীবনাচারে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। লর্ড মেকলের উত্তরাধিকারী সেই ‘দোভাষীদের’ কল্যাণে আমরা একটি নতুন শব্দ পেয়েছি। শব্দটি হলো ‘জেনারেশন গ্যাপ’। এর হাকিকত আড়াল করে তথাকথিত প্রগতিশীল মিডিয়া ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বলতে শুধু মা-বাবার সঙ্গে সন্তানদের দূরত্বের কথা উল্লেখ করে থাকে। তাদের মতে, নতুন প্রজন্ম ও পুরনো প্রজন্ম পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ করতে না পারাটাই ‘জেনারেশন গ্যাপ’। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ হলো, এক প্রজন্মের শিক্ষা, আদর্শ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ আরেক প্রজন্মের মধ্যে প্রজন্মান্তরিত না হওয়া। মুসলিম সমাজে এই ‘জেনারেশন গ্যাপ’ করে দেওয়া হয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে। ‘জেনারেশন গ্যাপ’ সৃষ্টির সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো ভাষা পরিবর্তন করে দেওয়া। ভাষার মাধ্যমে ভাব ও মূল্যবোধ প্রবাহিত হয়। ভাষা পরিবর্তিত হলে পরবর্তী প্রজন্ম পূর্ববর্তী প্রজন্মের মূল্যবোধ গ্রহণ করতে পারে না। ফলে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ তৈরি হয়। ব্রিটিশরা এ কাজটি করেছিল সুকৌশলে। তারা প্রথমে আরবি-ফারসি ভাষা নিষিদ্ধ করে ইংরেজি ভাষা চালু করে। আরবি-ফারসি ভাষা নিষিদ্ধ করায় ১১০০ বছরের সঞ্চিত মূল্যবোধ প্রজন্মান্তর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এর ফলে বাঙালি মুসলমান এখন শুধু ইংরেজদের মতো পোশাক, হেয়ার স্টাইল, ক্লিন শেভ, স্যুট-টাই-ই ধারণ করে না, তাদের এখন খাঁটি ইংরেজ হওয়ার স্বপ্ন পেয়ে বসেছে। বাংলাদেশের অবস্থা এখন এমন : এ দেশে যে যত বেশি শিক্ষিত বা প্রভাবশালী, তাঁর সন্তান তত বেশি নামিদামি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ালেখা করে। টাকা-পয়সা একটু বেশি হলে স্বদেশে সন্তানদের শিক্ষিত করার গরজও তাঁরা অনুভব করেন না।

‘আস্সালামু আলাইকুম’ না বলে ‘শুভ সকাল’ কিংবা ‘ শুভ সন্ধ্যা’ ইত্যাদি বলা এখন পুরনো ঐতিহ্য। নতুন ঐতিহ্য হলো ‘গুড মর্নিং ও গুড নাইট’। নতুন প্রজন্মের মধ্যে যেন সূর্যবিদ্বেষ পেয়ে বসেছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ যায়, অনেকের সূর্যের প্রথম আলো দেখার সুযোগ হয় না। বাঙালি মুসলমান এখন আর ‘ইন্তেকাল’ করে না, ‘মৃত্যুবরণ’ করে। মৃত্যুর পর বাঙালির ‘লাশ’ এখন ‘মরদেহ’ হয়ে যায়। বাঙালি মুসলমানের ‘মরদেহ’ এখন ‘কবরস্থ’ হয় না, ‘সমাধিস্ত’ হয়। বাঙালি মুসলমান এখন কবর জিয়ারত করে না, ‘এক মিনিট নীরবতা’ পালন করে। সমাধিসৌধে গেলেও তারা সুরা ফাতেহার পরিবর্তে ফুল দিয়ে মৃতদের স্মরণ করে।

বাঙালি এখন পহেলা বৈশাখে দেনা-পাওয়া পরিশোধ করে না, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের করে।

বাঙালি মুসলমানের এক শ্রেণির মানুষের কাছে সন্তানের আরবি-ফারসি নাম বাঙালিত্বের অন্তরায়। তাই তারা তাদের বাংলায় নাম রাখতে শুরু করেছে। একজনের নাম ‘প্রথম’, আরেকজনের নাম ‘দ্বিতীয়’। আমাদের পরিচিত একজন তাঁর ছেলের নাম রেখেছেন ‘ইচ্ছা’।

এখন আর কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানের সন্তানের সকাল শুরু হয় না। মক্তবকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন তাদের দৃষ্টিতে সেকেলে। বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে মসজিদে যাওয়ার গরজ এখন আর অভিভাবকরা অনুভব করেন না। মা-বাবা এখন আর সন্তানের অভিভাবক নন, বন্ধু। ফলে সন্তানদের শাসন করার পরিবর্তে তাঁরা বন্ধুসুলভ পরামর্শ দেন।

মা-বাবার সঙ্গে বউ-বাচ্চা নিয়ে যৌথভাবে থাকার প্রথা বাঙালি বহু আগেই অতিক্রম করেছে। এবার তারা মা-বাবাকেই ত্যাগ করতে শুরু করেছে। বছরের পর বছর মা-বাবাকে একটু দেখার ও কিছু অর্থকড়ি দেওয়ার সৌভাগ্য বহু বাঙালি মুসলমানের হয় না।

বাঙালি মুসলমানের সন্তানদের যৌনজীবনের গঠনপ্রক্রিয়া স্কুল-কলেজজীবনেই শেখা হয়ে যায়। তাই এখন বিয়ের জন্য অপেক্ষা করা বোকামি। ‘গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড তো থাকতেই পারে, তাই না?’—এমন প্রশ্ন ‘সাহসী’ বাঙালি তরুণীরা হরহামেশাই ছুড়ে দেন।

‘বিয়ে করলে সংসার করতে হবে’—আধুনিক বাঙালি মুসলমানের দৃষ্টিতে এমন ধারণা প্রগতিবিরোধী। তাই শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায়ই প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টির মতো বিচ্ছেদের আবেদন জমা হচ্ছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণ ও উত্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০১০-২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে তালাকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার। শহরে বাড়ছে একাকী মায়ের সংখ্যা। পারিবারিক কাঠামো প্রচণ্ড হুমকির মুখে।

বাঙালি মুসলমানের নতুন প্রজন্ম মুরব্বিদের দেখলে সালাম দেওয়া, চেয়ার ছেড়ে দেওয়ার ধার ধারে না। বাঙালি মায়েরাও এখন ‘একটু সুখের আশায়’ সন্তানদের খুন করতে শিখেছে। বাঙালি মুসলমানের সন্তানরা মাতা-পিতাকে খুন করার স্পর্ধাও ইতিমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে।

যে বাঙালি সমাজে হিন্দু-মুসলিম-নির্বিশেষে নারীরা শালীনতাপূর্ণ পোশাক পরিধান করত, কঠোর পর্দাপ্রথা মেনে চলত, তাদের সন্তানরা এখন জিন্স ও টি-শার্টে আধুনিকতা খুঁজে বেড়ায়।

বাঙালির এই সাংস্কৃতিক বিবর্তনের পেছনে শুধু যে ব্রিটিশদের গোলামি মার্কা শিক্ষাব্যবস্থা দায়ী তা-ই নয়, সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী এক শ্রেণির বৃদ্ধিজীবীও এর জন্য কম দায়ী নন। বুদ্ধিজীবিতার আড়ালে ভিনদেশি অর্থ নিয়ে তাদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে একদল ‘বুদ্ধিজীবী’ কাজ করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে । যে দেশে ড. শহীদুল্লাহ, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সৈয়দ আলী আহসানের মতো বুদ্ধিজীবী জন্ম নিয়েছেন, সে দেশে কারা আজ মুসলিম জাতির বিবেকের আসনে সমাসীন?

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় যে নৈতিক পচন ধরেছে, এ নিয়ে এসব বুদ্ধিজীবীর মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা এক জায়গায়—‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম কিভাবে সহাবস্থান করতে পারে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’ সম্প্রতি কয়েকজন বুদ্ধিজীবী মহাগবেষণা করে বের করেছেন যে ‘সম্ভাষণ, বিদায়সহ দৈনন্দিন নানা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কথাবার্তায় আরবি শব্দের ব্যবহার বাড়ছে। নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে হিজাব, নেকাব পরা এবং ছেলেদের মধ্যে ওয়াহাবি মতাদর্শ অনুসরণকারীদের মতো গোড়ালির ওপর প্যান্ট পরার প্রবণতা বাড়ছে।’ তবে ওই বুদ্ধিজীবীরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজি বলা ও ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ার প্রবণতা খুঁজে পাননি। হাজারো জিন্স ও টি-শার্ট পরা তরুণীর ভিড়ে তাঁরা ইউরোপীয় দুরবিন দিয়ে গুটি কয়েক হিজাবধারী তরুণীকে দেখে বেজায় বেজার। গোড়ালির ওপর প্যান্ট পরা পনেরো শ বছরের প্রতিষ্ঠিত সুন্নত। মহানবী (সা.)-এর এই সুন্নত সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে কোনো বিতর্ক নেই। মহানবী (সা.)-এর সুন্নতকে ওয়াহাবি আদর্শ আখ্যায়িত করা শুধু কি অজ্ঞতা, নাকি ধৃষ্টতাও! আর হ্যাঁ, কাপড় একটু ওপরে উঠলে সেটি যদি উগ্রতা হয়, তাহলে ছোট ছোট ড্রেস, আবেদনময়ী নামসর্বস্ব পোশাক নিশ্চয়ই সমধিক উগ্রতার পরিচায়ক! এমন উগ্রতা কারা উসকে দিচ্ছে?

পরিশেষে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে এম আর আখতার মুকুলের একটি কথা উল্লেখ না করে পারছি না। তিনি লিখেছেন, ‘অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, সে আমলে বাংলার মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির নবজাগরণ হচ্ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সম্পূরক শক্তি হিসেবে। এই নবজাগরণের মোদ্দাকথাটাই হচ্ছে বশ্যতা মেনে নিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল সুদৃঢ় করা।’ (কোলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *