বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক ও আধ্যাত্মিক রাহবার আলী মিয়া রহ.

আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)। সুখ-জাগানিয়া ও পুণ্যপ্রবাহে হৃদয়-মঞ্জিমা-স্নিগ্ধকর সুবিদিত নাম। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তক, সমাজ সংস্কারক ও আধ্যাত্মিক রাহবার। ইতিহাস, দর্শন, মনীষা, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, গবেষণা-এষণা, সাহিত্যসাধনা, চিত্ত-শুচিতা, উম্মাহর দরদ ও মুসলিম উম্মাহর দিব্যপ্রাণ-দরদি ভাষ্যকার- ইত্যাদি তাঁর নান্দনিক ও সপ্রতিভ জীবন-অভিধানের অনুসঙ্গ।

বিদ্বান ও বিদগ্ধজনের কাছে তাঁর পরিচয় নতুন নয়। অভিজ্ঞান, চেতনাপোলব্ধি, বোধ, দূরদর্শীতা, সাত্ত্বিকতার দ্যূতি দিয়ে তিনি উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আরব, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্য এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার দিক-দিগন্ত বর্ণোজ্জ্বল করেছেন। বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক প্রতিভা এবং প্রাণার্দ্রতার কারণে সর্ব শ্রেণির কাছে তিনি স্থায়ী আসন পেয়েছেন। বিরলপ্রজ এই মহান-মোহন ব্যক্তিত্ব ছিলেন শিক্ষা-আদর্শ, ঐতিহ্য-সভ্যতা ও মুসলিম জাগরণের পার্থসারথি। পূর্ববর্তী সাধক ও তাপস-সম্রাটদের সতত প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক ইসলামী সাহিত্যান্দোলনের স্বকৃত স্থপতি ও পৃথিকৃৎ।

তারুণ্যেই ‘সব গুণের আধার’
বর্ণালি শৈশব ও রঙিন কৈশোর পেরিয়ে তিনি যখন অনুর্ধ্ব বিশের তরুণ। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তখন তাঁকে ‘জামেউল কামালাত’ বা সব গুণ-কীর্তির আধার বলে খেতাব দেন। একই সঙ্গে যুগশ্রেষ্ঠ চারজন আধ্যাত্মিক নির্দেশক ও দীক্ষাগুরু থেকে খেলাফতপ্রাপ্ত হন। নিজের জীবন-আঙিনা করে তুলেন আলো-জ্বলমলে ফর্সা।

বয়সসীমা ত্রিশ পেরোনোর আগেই আলোড়ন সৃষ্টি করেন আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে। রচনা করেন জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মাজা খাসিরাল আলামু বি-ইনহিতাতিল মুসলিমিন’। যে গ্রন্থটি পাঠ করে মুসলিম-অমুসলিম পণ্ডিত, বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গ ও শীর্ষস্থানীয় আলোচকরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্সে যে গ্রন্থটি নিয়ে রব ওঠে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে লেখকের স্বাধীনতা পূর্ণরূপে স্বীকৃত না হলে এবং বৃটেনে কোনো বই প্রবেশ নিষিদ্ধ করার আইনগত সুবিধা থাকলে আমি একটি বই নিষিদ্ধ করতাম। আর বইটি হলো- ভারতীয় লেখক আবুল হাসান আলী নদভী রচিত- Islam and the world।

সপ্রতিভ পদচারণায় দীপ্তকর্ম
লখনৌর নদওয়াতুল উলামা থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক সেন্টার পর্যন্ত মনস্বী এ কলমসৈনিকের সপ্রতিভ পদচারণা। সাধারণ উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর ইতিহাসআশ্রিত গল্পগ্রন্থ ‘কাসাসুন নাবিয়্যিন’ বিভিন্ন দেশের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্নেহের ভাতিজার জন্য লেখা এই বই লাভ করে ‘দামেশক আরবি একাডেমি’ পুরস্কার।
তার কথামালা হয় সংকলিত। বক্তৃতা হয় গ্রন্থিত। রচিত পুস্তকাদি হয় মিষ্টি চেতনার সরস কাঠি। চিন্তার প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে প্রাণজ ও ভাবনাকুল দৃব্যদৃষ্টির সুখদ বারতা। বোধ, উপলব্ধি ও মূল্যায়ন হয় ইতিহাসের আকর নির্দেশনা। যে পুণ্যাত্মার জীবনযাত্রা শুরু হয় ‘আভিজাত্যময়’ দারিদ্র্যতার মাধ্যমে। জীবনের মধ্য গগণে প্রাচুর্য-বৈভবের স্রােত এলেও সারা অঙ্গ-সৌষ্ঠবে সাজিয়ে রাখেন দারিদ্র্যের গৌরব।

আধুনিকবিশ্বের প্রচারবিমুখ বুদ্ধিবৃত্তিক মহানায়ক
নয় বছর বয়সে বাবা হারানো ছেলেটি বেড়ে ওঠে পুণ্যময়ী মায়ের দোয়ার শামিয়ানা ও বড় ভাই ড. সাইয়েদ আবদুল আলী (রহ.)-এর বিশেষ তত্ত্বাবধানে। কিন্তু কে জানতো এ বালকই একদিন হয়ে উঠবেন আধুনিকবিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক, চিন্তা-গবেষণা, ইসলামী জাগরণ-বিপ্লব ও কর্মোচ্ছল সাধনার অন্যতম প্রাণপুরুষ।

পৃথিবীব্যাপী চষে বেড়ানো এ মনীষী যখন ভারতে নিজ কর্মস্থলে ফিরতেন, তখন শত শত তৃষিত হৃদয় তাকে ঘিরে ধরতো। তিনি সবাইকে নিষ্ঠাবিধৌত জ্ঞানবারিতে সিক্ত করতেন। বড় বড় রথী-মহারথী ও স্বনামধন্যরা সমবেত হতেন এই দিবাকরের আলোক-দীপ্তি পেতে। বিভিন্ন সময় ভারতের মন্ত্রী-উপমন্ত্রীরা আসতেন তাঁর পরামর্শ নিতে। গভর্নর আসতেন কিছু আরজ করতে। নদওয়ার মাঠে হেলিকপ্টার নামিয়ে সোজা আল্লামা নদভীর কক্ষপানে হাঁটা ধরতেন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বা রাজ্যসভার বড় বড় সদস্য। ইন্দিরা গান্ধী তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি অসম্মতি জানান। চলে যান রায়বেরেলির গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও প্রধানমন্ত্রী ছুটে যান সেখানে। রায়বেরেলির সড়কের নাম করণ করেন ‘আল্লামা আবুল হাসান আলী মিয়া নদভী মার্গ’। প্রচারবিমুখ এমন দরবেশকে প্রয়াত রাজীব গান্ধী ও অটল বিহারী বাজপেয়ীও ঘিরে ধরেন।

এই পৃথিবী একবার পায় তাকে…
১৯৯৮ সালে দুবাই সরকার তাঁকে শ্রেষ্ঠ ইসলামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনোয়ন করে। পদক, পুরস্কার ও সনদ গ্রহণ করতে দাওয়াত করে। কিন্তু তিনি সাফ জানিয়ে দেন, কোনো পদক-পুরস্কারের জন্য কোথাও যাননি; সুতরাং দুবাইও যাবেন না। অনেক কিছুর পর দুবাই সরকার ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলে। বিশেষ একটি বিমান দুবাই থেকে উত্তর প্রদেশের লখনৌ প্রেরণ করে। বিমানটি শায়খ নদভীকে নিয়ে যায় এবং অনুষ্ঠান শেষে পৌঁছে দিয়ে যায়।
শায়খ নদভীর জন্য ভারত সরকার লখনৌর আভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক করে। জরুরি বহির্গমনের অফিসিয়াল কাজের জন্য দিল্লি থেকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের লখনৌ পাঠায়। ভারতে এমন নজির এর আগে দেখা যায়নি। পরদিন বিশ্বমিডিয়ায় এ বিরল ঘটনাটি প্রচার হয়।

ইসলামের দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে পবিত্র কাবাঘরের চাবি হাতেগোনা কয়েকজন মানুষকে সম্মানসূচক দেওয়া হয়। তাদের একজন শহীদ বাদশাহ ফায়সা ও অন্যজন উপমহাদেশ বা গোটা অনারবের গৌরব শায়খ আলী মিয়া নদভী (রহ.)। কাবা শরিফের চাবি তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বিরল সম্মান জানানো হয়েছিল তাঁকে। আপন হাতে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে মহান আল্লাহর শোকর আদায় করেন।

আগ্নেগিরির উত্তাপ ছড়ানো রচনাকর্মে মহীয়ান
তাঁর লিখিত ছোট-বড় গ্রন্থের সংখ্যা দু’শতাধিক। আরবি সাহিত্যে তাঁর উচ্চ মার্গীয় পাণ্ডিত্যে বড় বড় আরব-সাহিত্যকরা রীতিমত বিস্ময় প্রকাশ করতেন। এসব গ্রন্থ বহু ভাষায় অনুদিত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামী সংস্কৃতি, দাওয়াত, তালিম ও তাবলিগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে। বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কার বিজয়ী শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ জ্ঞানতাপসের রচনাশৈলী, নান্দনিক বাক্যবিন্যাস, বর্ণনার সৌকর্য, দৃষ্টিভঙ্গির নিরম্বু গভীরতা ও বিষয়বস্তুর নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মুসলমানদের প্রাণে নতুন স্পন্দন সৃষ্টি করে। মুসলমানদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আনতে তাঁর কলম ছিল সদা সোচ্চার।

আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থারূপে ইসলামী চিন্তা-চেতনার অন্তর্নিহিত প্রতিপত্তি তাঁর বই ‘ইলাল ইসলাম মিন জাদিদ’। ইসলামের দেড় হাজার বছরের ধর্মীয় সংস্কার ও জাগৃতি আন্দোলনের নির্বাচিত মনীষীদের জীবনচরিত পাঁচ খণ্ড-বিশিষ্ট ‘রিজালুল ফিকরি ওয়াদ দাওয়াহ’ গ্রন্থে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেন। নিজের জীবনবৃত্তান্ত ও অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞান লিখে গেছেন ‘ফি মাসিরাতিল হায়াত’-এ। জীবনের শ্রেষ্ঠ কৃতিত্বগুলো নিজে লিখতে বিব্রতবোধ করতেন, তাই সেসব নিজে লিখেননি। পরবর্তীতে অন্যরা বিভিন্ন গ্রন্থ-প্রবন্ধে তার বর্ণনা দিয়েছেন।

শৃঙ্খলিত জীবনে মহান লক্ষ্য পানে…
আমল-আজকার, গভীর চিন্তামগ্ন এই সাধকপুরুষ কঠোর শৃঙ্খলিত জীবন যাপন করতেন। শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে অনেক রাজা-বাদশাহ ও বড় বড় দিকপালের পত্র-চিঠিও পড়েছেন অনেক ঘণ্টা পরে। জীবনের মাপা সময় কখনো অপচয় হতে দেননি তিনি।
চোখে অসুবিধা ছিল তাই খুব বেশি লিখতে পারতেন না। শ্রুতিলিপি করার জন্য ছিলেন বিশেষজ্ঞ সহযোগী। পত্রের জবাব লেখার জন্য, প্রকাশনা সহকারী, তথ্য ও উৎসগ্রন্থ অনুসন্ধান, তাফসির-হাদিস ও ফিকাহবিষয়ক গবেষণা সহযোগী, আন্তর্জাতিক ও মিডিয়া অ্যাডভাইজার, ইংরেজি ও উর্দু ভাষ্যকার, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সহযোগী এবং ইউনিভার্সাল লিগ অব ইসলামিক লিটারেচার ইত্যাদি বিষয়ে প্রধান সহযোগী নিয়ে ছিল তাঁর হাতে তৈরি চিন্তাকর্মের বাহিনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনার সুশৃঙ্খল বলয়।

পদধূলিতে ধন্য করেছেন এই ভূমি
শায়খ নদভী বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়খ আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভীর আহ্বানে দুইবার বাংলাদেশ সফর করেন (১৯৮৪ ও ১৯৯৪ সালে)। বাংলাদেশের আলেমদের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিনি চাইতেন বাংলা ভাষায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো অনূদিত হোক। এ বিষয়ে তিনি খোঁজ খবরও রাখতেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বাংলাভাষা ও সাহিত্যে আলেমদের ব্যাপকহারে এগিয়ে আসার তপ্ত আহ্বান জানান তিনি। হৃদয় বিগলিত দরদ নিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে বাংলা ভাষার বাগডোর অন্যদের হাতে ছেড়ে দেবেন না। আপনারা চিরকাল পাঠক হবেন, আর অন্যরা লেখক হবে- এটা কাম্য নয়; শোভনীয় নয়। বাংলা ভাষাচর্চায় শিথিলতা আলেমদের বাংলাদেশে অপাঙক্তেয় করে দেবে। সতর্ক থাকুন সবসময়।’
সারা দুনিয়ায় তাঁর ২৩জন খলিফার মধ্যে বাংলাদেশের আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী, মাওলানা মুহাম্মদ সালমান ও মাওলানা আবু সাঈদ ওমর আলী (রহ.) রয়েছেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় শায়খ নদভীর চিন্তাধারার সঙ্গে এ দেশের আলেমসমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের পরিচয় ঘটে।

কর্মমুখর জীবনের অতি সংক্ষিপ্ত নির্ঘণ্ট
১৯৩৪ সালে তিনি দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তাফসির, হাদিস, আরবি সাহিত্য ও ইতিহাসের শিক্ষা দেন। ১৯৩৪ সালে তিনি বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধও হন। ১৯৩৯ সালে ভারতের বিভিন্ন জয়গায় ইলমি সফর করেন। এই সফরে তিনি মাওলানা শায়খ আবদুল কাদির রায়পুরী (রহ.) ও তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মদ ইলয়াস কান্ধলভী (রহ.)-এর সঙ্গে স্নেহভাজন হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তাদের নিজের কর্মজীবনের পরামর্শদাতারূপে গ্রহণ করেন। শায়খ রায়পুরী কাছ থেকে তিনি আত্মশুদ্ধি বিষয়ক পরামর্শ নিতেন। দ্বিতীয়জনের কাছ থেকে ধর্মপ্রচার, উম্মাহ-চেতনা ও সমাজ-সংস্কার বিষয়ক পরামর্শ পেতেন। আরবদেশগুলোতে তাবলিগ জামাতকে পথ-পরিচয় করে দেওয়ার মূল নায়কও তিনি। সারাজীবন তিনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

১৯৪৩ সালে দ্বীনি শিক্ষার জন্য ‘আন্জুমানে তালিমাতে দ্বীন’ নামক একটি অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি নদওয়াতুল উলামার প্রশাসনিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে নদওয়াতুল উলামার তৎকালীন শিক্ষা বিভাগের পরিচালক সাইয়েদ সুলাইমান নদভী (রহ.)-এর অনুরোধে শিক্ষাবিভাগের উপ-পরিচালকের দায়িত্ব নেন। ১৯৫৪ সালে সুলাইমান নদভীর ইন্তেকালের পর তিনি শিক্ষাবিভাগের পরিচালক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে বড় ভাই ড. আবদুল আলী আল-হাসানীর মৃত্যুর পর তিনি নদওয়াতুল উলামার মহাসচিব নির্বাচিত হন।

১৯৫৫ সালে ঐতিহ্যবাহী ও বিশ্বখ্যাত আরবি পত্রিকা ‘আল-বাস আল-ইসলামী’ ও ১৯৫৯ সালে পাক্ষিক ‘আর-রাইদ’-এর সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে দামেশকের ‘আরবি ভাষা ইনস্টিটিউট’-র সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৯ সালে লখনৌতে ‘ইসলামিক গবেষণা ও প্রকাশনা সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬২ সালে মক্কায় সৌদি আরবের গ্র্যন্ড মুফতি শায়খ মুহাম্মদ বিন ইবরাহিম উপস্থিত থাকতে না পারায় তিনি ‘রাবেতাতুল আলম আল-ইসলামি-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে সৌদি আরবের শাসক সাউদ বিন আবদুল আজিজ, লিবিয়ার শাসক ইদরিস সেনুসিসহ আরো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। এই অনুষ্ঠানেই তিনি ‘সা¤প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ইসলাম’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন।

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শ কমিটির একজন সদস্য ছিলেন। ১৯৬৮ সালে সৌদি শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ বিভাগের পাঠ্যসূচী প্রণয়নে পরামর্শ দেওয়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১৯৮০ সালে জর্দান আরবি একাডেমির সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছর ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক সেন্টারের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী সাহিত্য সংস্থা’র প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক নির্বাচিত হন।

গৌরবদীপ্ত বন্দনায় নন্দিত জীবন
জীবদ্দশায় তাঁর জীবনকর্মের উপর ২৫টি পি.এইচ.ডি থিসিস হয়। তার দুই শতাধিক গ্রন্থের প্রায়গুলো প্রাচ্য ও প্রশ্চাত্যে পৃথিবীর প্রধান প্রধান ভাষায় অনুদিত হয়েছে। মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। জীবদ্দশাতেই তাঁর নামে মদিনায় সড়কের নামকরণ করা হয়।

প্রজন্মের বিরল শিক্ষাবিদ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তারচেয়ে বড় কোনো পণ্ডিতের চর্চা তাঁর জীবদ্দশায় দেখা যায়নি। তিনি ইসলামিক সেন্টার জেনেভা, ইউএসএ আরবি একাডেমি, লন্ডনের ইসলামিক সেন্টারসহ ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অসংখ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ ছিলেন। ভারত সরকারের সম্মানসূচক সবকটি পদক পেয়েছেন। ভারতবর্ষে ইসলাম শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দের আজীবন সভাপতি ছিলেন। দাওয়াত ও তাবলিগের অন্যতম মুরুব্বি ছিলেন। নিউজিল্যান্ড থেকে চিলি- পৃথিবীর সব আলেমদের শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ভালোবাসায় ঋদ্ধ তার জীবন।

জীবন ছেড়ে মহাজীবনের পথে
প্রখ্যাত এই ক্ষণজন্মা মনীষী, প্রখ্যাত দাঈ, প্রচারবিমুখ বুজুর্গ-সাধক, শুভার্থী ও ইসলামী চিন্তানায়ক, ইতিহাসের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও উম্মাহর দরদি অভিবাবক আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) ১৯৯৯ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর (২৩ রমজান, রোজ শুক্রবার, ১১.৫০ মিনিটে) পবিত্র কোরআন শরিফের সুরা ইয়াসিন তিলাওয়াতরত অবস্থায় মহান প্রভুর সান্যিধ্যে গমন করেন।

ভারতীয় জনতার বিপুল সমাগম ও শোকাভিভূত পরিবেশ সৃষ্টির ভয়ে আত্মীয়রা তাঁকে ইন্তেকালের দিন রাত দশটার মধ্যেই দাফন করে নেন। রাতটি পার হলে ভিড় সামলানো কারো পক্ষে সম্ভব হতো না। পরদিন লাখো জনতা এসে কেবল বকর জিয়ারত করেন। জানাজা ও দাফনকাজে শরিক হতে কাতারের বাদশাহ ও বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও চিন্তাবিদ আল্লামা ড. ইউসুফ আল-কারাদাভি বিশেষ বিমান যোগে রাতেই দোহা থেকে লখনৌ এসে পৌঁছান। কিন্তু নদওয়ার ফ্যাক্স সংযোগ দুর্বল থাকায় তাদের বার্তা কর্তৃপক্ষ পায়নি। ফলে তাঁরা জানাজা ও দাফনে শরিক হতে পারেননি। উত্তর ভারতের কঠিন শীত ও কুয়াশার কারণে তাঁরা রাতে ফিরতেও পারেননি। পরদিন বিষাদক্লিষ্ট মনোরথের বাদশাহকে নিয়ে বিশেষ বিমানটি ভারত ত্যাগ করে।
তাঁর ইন্তিকালের খবর মক্কা-মদিনায় পৌঁছালে, সেখানকার শাসকবর্গ ২৭ রমজান তারাবির পর পবিত্র দুই হারামে আল্লামা নদভীর গায়েবি জানাজা আদায়ের ব্যবস্থা করেন। এতে বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ মুসলিম শরিক হন।

তাঁর মতো কীর্তিমান ব্যক্তির মৃত্যু নেই। পুণ্যযাত্রার ক্ষয় ও শেষ নেই। পৃথিবীতে তিনি কীর্তি ও অবদানে ভাস্বর। তার সৃজিত রচনা ও দরদমাখা সাহিত্যপ্রসূন ও সৃষ্টিমুখর কর্মের কারণে তিনি যুগ পরম্পরায় চির অমর হয়ে থাকবেন। আল্লাহ তাঁর কবরে রহমতের ফল্গুধারা অব্যাহত রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *